বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা

0

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা (১৯৭১ থেকে ২০০০)

ঔপনিবেশিক আমলের দু’শ বছরেরও অধিককাল শোষণ আর বৈষম্যমূলক নীতি ও পরিকল্পনায় জীর্ণ, পাকিস্তান আমলের নয়া-ঔপনিবেশিক বঞ্চনায় ভঙ্গুর এবং মুক্তিযুদ্ধকালে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার অব্যবহিতই পরে তৎকালীন সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করেন। দেশের নব প্রণীত সংবিধানে সকল শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়- “রাষ্ট্র
– একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য
– সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজনে সিদ্ধ করিবার জন্য উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য
– আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে”

সাংবিধানিক প্রেরণা ও অঙ্গীকার পূরণে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে জাতীয়করণ করেন। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৬,১৬৫ প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ১,৫৭,৭৪২ জন শিক্ষককে সরকারি চাকুরীজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ ঘোষণা প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে এবং শিক্ষাকে উন্নয়নের উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সুদীর্ঘকালধরে বঞ্চিত প্রাথমিক শিক্ষকদের মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় আরও প্রস্তাব করা হয় প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) দেশে ৫ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।

রাষ্ট্রীয়করণের পর দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ সালে এ দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ছিল ২৯০২৯, স্বাধীনতা অর্জনের ৫ বছরের মধ্যে বিদ্যালয় সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ৪৫ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার সরকারি বিদ্যালয়। বর্তমান সময়ে (২০১৩) ২৬ হাজার ১৯৩ বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কেও সরকারিকরণ করায় সরকারি ও বেসবকারি স্কুলের মধ্যে যে বৈষম্য ছিল তা ব্যাপকভাবে দূর হয়েছে। উল্লেখ্য, ৮০ দশকে বিদ্যালয় গমন উপযোগী ১০০ জন শিশুর মধ্যে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতো ৫৮- ৫৯ জন। এদের মধ্যে আবার ৮০ ভাগ শিশু ঝরে পড়ত। স্থিতির হার ছিল মাত্র ২০ ভাগ। ৯০ এর দশকে ভর্তির হার বৃদ্ধি পায় এবং ৯৬.২০ ভাগ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। একই সাথে ঝরেপড়ার হার হ্রাস পেয়ে হয় ৪৯.৬০ ভাগ এবং স্থিতির হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় শতকরা ৫০.৪০ ভাগ। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে ৭০ দশকে দেশের সাক্ষরতা হার যেখানে ছিল ১৭ ভাগ। ৯০ দশকে এ হার হয় ৪৪ ভাগ। ২০০০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬২ ভাগ। এ সময়ে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে লিঙ্গ সমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ১৯৭০ সালে প্রাথমিক স্তরে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর মধ্যে বালক বালিকার অনুপাত ছিল ৭০:৩০। আশির দশক থেকে এ অনুপাত কমতে থাকে এবং ১৯৯৫ সালের পর থেকে পূর্ণমাত্রায় সমতা অর্জিত হয়েছে।
জাতিসংঘ তার অঙ্গ সংগঠনের মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৯০ সালের ৫ থেকে ৯ মার্চ থাইল্যান্ডের জমতিয়েন শহরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে। এ সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল ২০০০ সালের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক দেশ তাদের জাতীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৪ বছর বয়সের কমপক্ষে ৮০ ভাগ শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এ সম্মেলনে বাংলাদেশ সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল; ২০০০ সালের মধ্যে-
– শিক্ষার্থী ভর্তির হার ৯৫ ভাগে উন্নীত করা
– মেয়ে শিশু ভর্তির হার ৯৪ ভাগে উন্নীত করা
– প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপন হার ৭০ ভাগে উন্নীত করা
জমতিয়েন ঘোষণার পর বাংলাদেশ শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি করে প্রাথমিক শিক্ষার পরিমাণগত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে।

১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ অনুযায়ী সকল অভিভাবক তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয় গমনোপযোগী সন্তানকে (আইনগত কারণ ছাড়া) নিকটবর্তী কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে বাধ্য। প্রথমে কয়েকটি উপজেলায়, পরবর্তীতে তা আরও এলাকায় সম্প্রসারিত করা হয় এবং ১৯৯৩ সালে সারাদেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়। কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে এ আইনের সমর্থনে দারিদ্র্যসীমার নিচে যেসকল পরিবারের আয় তাদের শিক্ষার জন্য ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছর থেকে শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি চালু করা হয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে ১৯৯২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক একটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ সৃষ্টি করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় পরিমাণগত অগ্রগতির সাথে গুণগতমানের উন্নয়ন প্রয়োজন। তাই শিক্ষার্থী ভর্তি হার বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সাথে শিক্ষার মানও পর্যালোচনা করা হতে থাকে। ১৯৯২ সালে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা যেমন পড়া, লেখা, এবং গণিতের দক্ষতা মূল্যায়নে দেখা যায়, সদ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩৫ শতাংশ ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। ১৯৯৬ সালে পরিচালিত বিআইডিএস পরিচালিত অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, চতুর্থ শ্রেণির ৩০ ভাগের অধিক শিক্ষার্থী শতকরা ৪০ ভাগের কম নম্বর পায়। অপরপক্ষে, শতকরা ১৩ ভাগ শিক্ষার্থী শতকরা ৭০ ভাগ নম্বর পায়। শুধুমাত্র পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি নয়, গুণগতমানও ক্রমান্বয়ে ধীরগতিতে হলেও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরিকল্পনাসমূহে পরিমাণগত প্রবৃদ্ধির সাথে গুণগত সমৃদ্ধির বিষয়ও গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতে থাকে। গুণগতমান অর্জনে ধীরগতি থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে এসময় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল একইসাথে প্রাথমিক শিক্ষার পরিমাণগত ও গুণগতমানের উন্নয়ন।

প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব ও কাজের পরিধি বিবেচনায় ২০০৩ সালে পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। জমতিয়েন সম্মেলনের পর সেনেগালের রাজধানী ডাকার শহরে ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে সবার জন্য শিক্ষা বাস্তবায়নে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন সংগঠন এক সম্মেলনে একত্রিত হয়। এ সম্মেলনে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রের লক্ষ্যসমূহ নিয়ে সর্বসম্মত যে অঙ্গীকার স্বাক্ষরিত হয় তা নিম্নরূপ :
– সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুসহ সকল শিশুর প্রাক-প্রাথমিক ও শৈশবকালীন শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন
– নারী, সংখ্যালঘু ও সংঘাতময় পরিস্থিতির শিকার সহ সকল শিশুর জন্য ২০০৫ সালের মধ্যে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলকভাবে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ
– শিক্ষা ক্ষেত্রে সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে সকল শিশুর প্রবেশাধিকার ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা
– মেয়ে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের বাধাসমূহ হ্রাস বা অপসারণের মাধ্যমে ২০১৫ সালের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ণ ও সুষম প্রবেশাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিতে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা
– শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও মান উন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর পঠন এবং গণনা প্রদর্শন ও পরিমাপন দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করা।

জমতিয়েন সম্মেলনের ঘোষিত লক্ষ্য প্রতিবেশি দেশসমূহের তুলনায় বাংলাদেশ অধিক সম্মানজনকভাবে অর্জন করে। বাংলাদেশ অচিরেই পরিমাণগত উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করতে সমর্থ হয়। ডাকার সম্মেলনের পর বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে।

Share.

About Author

Leave A Reply